|

মৃত্যু নিবন্ধন কি | মৃত্যু নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে?

জন্ম নিবন্ধনের মতই মৃত্যু নিবন্ধন সনদ টির সাথে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। বিভিন্ন প্রয়োজনে মৃত ব্যক্তির মৃত্যু নিবন্ধন করাতে হয়। তবে অনেকেই জানতে চাই মৃত্যু নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে?

মূলত মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর তথ্য স্থানীয় নিবন্ধন কর্তৃক রেজিস্টার করাই হলো মৃত্যু নিবন্ধন। এই মৃত্যু নিবন্ধনের পর প্রাপ্ত মৃত্যু সনদ বা Death Certificate আমাদের নানা রকমের কাজে প্রয়োজন হয়। সরকারি ও বেসরকারি এবং পারিবারিক নানা কর্মকান্ডে এটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট হিসেবে কাজ করে।

তাই চলুন মৃত্যু নিবন্ধন কি, মৃত্যু নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে, মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

মৃত্যু নিবন্ধন কি?

নতুন নিবন্ধন হলো মৃত ব্যক্তির নাম, লিঙ্গ, মৃত্যুবরণ করার তারিখ, স্থান, মৃত ব্যক্তির পিতা-মাতার নাম, মৃত ব্যক্তির স্বামী/ স্ত্রীর নাম ইত্যাদি উল্লেখ করে নিবন্ধক কর্তৃক রেজিস্টার করা। মৃত্যু নিবন্ধন করার পর নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে যেই সনদ দেওয়া হয়, সেটিকে মৃত্যু সনদ বা Death Certificate বলা হয়।

বাংলাদেশে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলরের কার্যালয় এবং পৌরসভা কার্যালয়ের মাধ্যমে এই মৃত্যু নিবন্ধন করা হয়। মৃত্যু সনদ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করলেই, সেখানে কর্মরত নিবন্ধক কর্মকর্তা মৃত্যুর তথ্য রেজিস্টার করে সনদ তৈরি করে দিবে।

বর্তমানে প্রতিটি ব্যক্তির জন্ম নিবন্ধনের মতোই, মৃত্যুবরণ করার পর মৃত্যু নিবন্ধনেরও প্রয়োজনীয়তা অনেক। কারণ এই মৃত্যু সনদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক সম্পত্তি বণ্টন করা হয়।

আরও পড়ুনঃ জন্ম নিবন্ধন কি | জন্ম নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে?

আরও পড়ুনঃ জন্ম নিবন্ধন হেল্পলাইন ও রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় ঠিকানা

মৃত্যু নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে?

মূলত মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টন, পেনশন প্রাপ্তি ইত্যাদি কাজে মৃত্যু সনদের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও আরো বিভিন্ন কারণে মৃত্যু নিবন্ধন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা গুলো বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরা হলো:

(১) ওয়ারিশ সনদ তৈরি করতে

একজন ব্যক্তির ওয়ারিশ কে কে রয়েছে, সে সম্পর্কিত তথ্য নিশ্চিত করতে মৃত্যু সনদের প্রয়োজন হয়। সাধারণত বাংলাদেশে পিতা-মাতার সম্পত্তি বন্টন করা হয় তাদের মৃত্যুবরনের পর। এক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সকল ওয়ারিশগন যেন সঠিক পরিমাণে সম্পত্তির ভাগ পায় তা নিশ্চিত করতে ওয়ারিশ সনদ তৈরি করা হয়। 

ওয়ারিশ সনদ/ উত্তরাধিকার সনদ তৈরি করতে হলে, সবার আগে মালিকানাধীন ব্যক্তির পরিচয়বাচক তথ্য এবং সন্তানাদির তালিকা দিতে হয়। এক্ষেত্রে যদি সেই ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে থাকে, তাহলে মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ জমা দিয়ে এবং অন্যান্য কাগজপত্র ও তথ্যাদি দিয়ে ওয়ারিশ সনদ তৈরি করা যায়।

(২) মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টন

মৃত ব্যক্তির জমি-জমা ও অন্যান্য যে সকল সম্পত্তি রয়েছে, তা সঠিকভাবে বন্টন করতে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সেই ব্যক্তির মৃত্যুর সনদ থাকতে হবে। মৃত্যু সনদে থাকা পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতেই সম্পত্তি বন্টন করা হয়। 

অন্যদিকে, কোন ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করার আগে পর্যন্ত সেই ব্যক্তির সম্পদ অন্যরা বন্টন করতে পারেনা। এক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট হলো মৃত্যু সনদ। আর এই সনদ জমা দিয়েই ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে, সেই ওয়ারিশদের মাঝে সম্পত্তির বন্টন করা যায়।

(৩) পারিবারিক পেনশন প্রাপ্তি

মৃত ব্যক্তির যদি সরকারি চাকরিজীবী হয়ে থাকে, তাহলে তার মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা বা উত্তরাধিকারীরা সে ব্যক্তির পেনশন প্রাপ্ত হবে। এমতাবস্থায়, ব্যক্তির পেনশন পাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদেরকে অবশ্যই ব্যক্তির মৃত্যু সনদ জমা দিতে হয়।

তাছাড়া পেনশনের সম্পত্তি ভাগ-বন্টন করার ক্ষেত্রেও মৃত্যু সনদ একটি প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ।

(৪) মৃত ব্যাক্তি লাইফ ইনসুরেন্স দাবি আদায়

মৃত ব্যক্তি যদি তার জীবদ্দশায় কোন কোম্পানিতে লাইফ ইন্সুরেন্স/ জীবন বীমা করে থাকে, তাহলে সেই বিমার প্রাপ্ত সম্পত্তি সেই ব্যক্তির ওয়ারিশদের মাঝে কিংবা নমিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই মৃত ব্যক্তির জীবন বীমার অর্থ আদায় করার জন্য মৃত্যু সনদ বা Death Certificate জমা দিতে হয়।

(৫) মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি নামজারি করতে 

মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বন্টন করার পর, তার ওয়ারিশগন যখন সেই সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি/ খারিজ করতে চায়, তখনও মৃত্যু সনদের প্রয়োজন হয়। কারন একজন ব্যক্তির সম্পদ অন্য কেউ নিজের নামে বৈধভাবে খারিজ করতে পারে না। 

তাই সম্পত্তি নামজারি/ খারিজ করার জন্য সেই ব্যক্তির মৃত্যু সনদ দেখিয়ে, ওয়ারিশ সূত্রে সম্পত্তি প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করে নামজারির জন্য আবেদন করতে হয়।

(৬) বিধবা ভাতা পেতে

বাংলাদেশের বিধবা অসহায় নারীদের সরকারিভাবে ভাতা প্রদান করা হয়। বর্তমানে যে সকল বিধবা নারীরা এই ভাতার আওতায় রয়েছে, তারা প্রতি মাসে ৫৫০ টাকা করে সরকারি ভাতা পেয়ে থাকে।

বিধবা ভাতা পাওয়ার জন্য কোন বিধবা নারী আবেদন করলে, আবেদনের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট হলো তার স্বামীর মৃত্যু সনদ।

(৭) সরকারি আদমশুমারি কাজে 

বাংলাদেশ আদমশুমারির মাধ্যমে জনসংখ্যা গণনা করা হয়। এক্ষেত্রে দেশের মোট জনসংখ্যা সঠিকভাবে নিশ্চিত করার জন্য মৃত্যু নিবন্ধন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধুমাত্র জীবিতদের হিসাব রাখলেই সঠিক জনসংখ্যার জানা সম্ভব হবে না। বরং পাশাপাশি যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের তালিকা জেনেই দেশের সঠিক জনসংখ্যার ধারণা পাওয়া সম্ভব।

(৮) অন্যান্য

মৃত ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় যদি কোন কোম্পানিতে চাকরি করলে, সেই কোম্পানি থেকে প্রণোদনা পেতে মৃত্যু নিবন্ধন কাজে লাগে। আবার মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশগণ বা স্ত্রী-সন্তান বিভিন্ন সরকারি প্রণোদনা, ভাতা, ত্রান ইত্যাদি পেতেও এই সনদের প্রয়োজন হয়।

আরও পড়ুনঃ মৃত্যু নিবন্ধন করতে কি কি লাগে?

মৃত্যু নিবন্ধনের জন্য কারা মৃত্যু তথ্য প্রদান করবে/ করতে পারবে?

কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করার পর তার পুত্র বা কন্যা বা অভিভাবকদের কে মৃত্যুর ৩০ দিনের মধ্যে মৃত্যু সংক্রান্ত তথ্য স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/ পৌরসভা কার্যালয়ে নিবন্ধকের নিকট দিতে বলা হয়েছে। মূলত তার পরিবারের সদস্যরা নিজ দায়িত্বে এই সনদটি তৈরি করে নেওয়া উচিত।

এছাড়াও আরো যারা মৃত্যু তথ্য নিবন্ধকের কাছে প্রদান করতে পারবে, তারা হলো:

  • ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, এবং সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সচিব।
  • সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার কাউন্সিলর
  • সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রাম পুলিশ।
  • ইউনিয়ন পরিষদ ভুক্ত এলাকায় কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার কল্যাণকর্মী
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মসূচি রা আওতায় নিয়োজিত বেসরকারি মাঠকর্মী।
  • কোন সরকারী বা বেসরকারী হাসপাতাল বা ক্লিনিক বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে মৃত্যুবরণ করলে, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার, ডাক্তার বা নির্দিষ্ট কোন কর্মকর্তা। 
  • কোন গোরস্থান বা শ্মশানের তত্ত্বাবধায়ক ব্যক্তি।
  • জেলখানায় মৃত্যুবরণ করলে, জেল সুপার বা জেলার বা তাদের কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন ব্যক্তি। 
  • পরিচয়হীন মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদ/ পৌরসভা কার্যালয়ের নিবন্ধক কর্তৃক নিয়োজিত অন্য কোন কর্মকর্তা, কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠান থেকে মৃত্যু তথ্য নিবন্ধকের কাছে প্রদান করতে পারবে।

শেষকথা

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারলাম মৃত্যু নিবন্ধন কি, মৃত্যু নিবন্ধন কি কি কাজে লাগে এবং কারা মৃত ব্যক্তির তথ্য স্থানীয় নিবন্ধনকে জানাতে পারবে। আশা করি, আপনি মৃত সনদের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *